নিজস্ব প্রতিবেদক | মধুপুর (টাঙ্গাইল): টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের গড়গড়িয়া এলাকায় একটি লেক খনন ও সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে বন বিভাগ এবং স্থানীয় গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গারোদের দাবি, তাদের প্রথাগত মালিকানাধীন জমিতে অবৈধভাবে লেক খনন করা হচ্ছে। অন্যদিকে বন বিভাগ বলছে, বন্যপ্রাণীর তীব্র পানি সংকট নিরসনে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরেই সরকারি জমিতে এই কার্যক্রম চলছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়াচ্ছে।
গারো সম্প্রদায়ের দাবি ও প্রতিবাদ: লেক খনন বন্ধের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র জনতা’র ব্যানারে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের পঁচিশ মাইল এলাকায় একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, লেক খননের নামে তাদের জমিতে মাটি ভরাট করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠনের সম্পাদক অলিক মৃ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক উজ্জ্বল আজিম জানান, গড়গড়িয়া লেক ও এর আশপাশের ভূমি গারোদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকার রয়েছে। এর আগে বন বিভাগ দোখলা রেঞ্জের চুনিয়া মৌজায় গারোদের আবাদি জমি দখল করে কৃত্রিম লেক খননের চেষ্টা চালিয়েছিল, যা ব্যাপক আন্দোলনের মুখে বন্ধ হয়ে যায়। নতুন করে এই লেক সম্প্রসারণকে তারা সম্পূর্ণ অবৈধ বলে মনে করছেন।
বন বিভাগের ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয়তা: বন বিভাগ জানিয়েছে, ‘মধুপুর শালবন পুনরুদ্ধার কার্যক্রম’-এর আওতায় জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জের লহুরিয়া বিটের গভীর জঙ্গলে গড়গড়িয়া লেকটি ১ হাজার ১৬৫ ফুট পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাঁচ দশক আগে খনন করা ৬৬৫ ফুট দীর্ঘ পুরোনো লেকটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে বনাঞ্চলে পানির তীব্র হাহাকার দেখা দেয়।
জাউসের ফরেস্ট রেঞ্জার মোশারফ হোসেন জানান, শুষ্ক মৌসুমে বনাঞ্চলের নদী, বাইদ ও খাল শুকিয়ে গেলে বানর, হনুমান ও হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী পানির সন্ধানে লোকালয়ে গিয়ে হামলার শিকার হয়। লহুরিয়া বিটের সংরক্ষিত প্রজনন কেন্দ্রে থাকা হরিণ, ময়ূর ও কাছিমও পানি সংকটে পড়ে। বন্যপ্রাণীর জীবন রক্ষার্থেই এই লেক সম্প্রসারণ জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: সরেজমিনে দেখা যায়, খননকৃত জায়গাটি মূলত দুটি টিলার মাঝখানের একটি সর্পিল খাল। বর্ষায় আশপাশের টিলার পানি এখানে জমে বাইদ হয়ে বানার নদীতে গিয়ে পড়ে। বনের ভেতরেই খনন করা মাটি ফেলা হচ্ছে। আশপাশে কোনো ঘরবাড়ি নেই।
মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব বলেন, "লেক সম্প্রসারণের পাশাপাশি বনাঞ্চলের আরও ১০টি পুকুর সংস্কার করা হচ্ছে। বনবাসী ও বন্যপ্রাণী উভয়ের স্বার্থেই এই কাজ চলছে, এর বিরুদ্ধে কেন আন্দোলন হচ্ছে তা বোধগম্য নয়।"
সামাজিক বনায়নের সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোত্তালেব হোসেন জানান, এক সপ্তাহ আগে লেক খনন উদ্বোধনকালে গারো নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তাদের কোনো জমি বা ঘরবাড়ি নেই। বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, তাই এই লেকটি সবার জন্যই প্রয়োজন।
সার্বিক বিষয়ে টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহাম্মদ মোহসিন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "সংরক্ষিত বনে কখনো কারো কোনো প্রথাগত ভূমি অধিকার থাকে না। গারোদের জমিতে লেক খনন হচ্ছে না। একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ইঙ্গিতে কিছু যুবক অযথা বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।"
মন্তব্য করুন